ভুটানের বিখ্যাত নিদর্শন রিং পুং ডিজং 

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শান্ত প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা এক ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল

বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ভুটানের বিখ্যাত নিদর্শন রিংপুং ডিজং। ছবি : মাউনটেন লেয়ার্স ট্রেকস

 রিংপুং ডি জং ভুটানের বিখ্যাত নিদর্শন যা পারো ডিজং নামে পরিচিত। এটি ভুটানের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যবিদ্যার এক অনন্য উদাহরণ যেখানে রয়েছে কারুকার্য করা মন্দির, বিস্তৃত আঙ্গিনা এবং এখানে যে সকল কাজের জায়গা ও আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে সবকিছু বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত। রিং পুং ডি জং-এর পুরো নাম অনুবাদ করা হয়েছে 'রত্নের ওপর একটি দুর্গ'-এই নাম অনুসারে। এই ধরনের নামকরণ করার কারণ, এটি ধন-দৌলতে পরিপূর্ণ এক ভান্ডার সামগ্রী। রিং পুং ডিজং যেহেতু ভুটানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন তাই প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে ভ্রমণ করতে আসে। ভুটানে আগত পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গা হিসেবে রিং পুং ডি জং এক নম্বর স্থান দখল করে আছে। পর্যটকরা পারো উপত্যকার যেখানেই অবস্থান করুক না কেন সেখান থেকেই রিং পুং ডি জং দেখতে পাবেন। সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতকের দিকে ভুটানের বিখ্যাত এক রাজা রিং পুং ডিজং তৈরি করেছিলেন উত্তর দিকস্থ শত্রুদের বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। বর্তমানে এটি সন্ন্যাসীদের আবাসন ব্যবস্থা ও থাকার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং সরকারি অফিস ও সামাজিক বিভিন্ন কেন্দ্র রয়েছে। এখানে প্রতিবছর অসংখ্য সিনেমারও শুটিং হয়ে থাকে।

বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত ডিজং। ছবি : সামডে নোমাটিক

রিং পুং ডিজং পারোর তীরে অবস্থিত। পারো অঞ্চলটি সহজে সংযোগ স্থাপন করেছে কোলকাতা, নয়াদিল্লি, শিলিগুড়ি, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর ও ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলের সাথে। তাই পর্যটকরা খুব সহজেই এখানে যাতায়াত করতে পারে। রিং পুং ডিজং বেশ কিছু রহস্যময় গল্প রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফাজো ড্রাগুম এর নাতি গিয়েচোক ব্রহ্মতত্ত্ব বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিব্বত ভ্রমণ করেছিলেন। যখন ব্রক্ষ্মতত্ত্ব বিদ্যা শেষে ফিরে এলো তার পরিবারের কাছে, দুর্ভাগ্যবশত পরিবারের কেউই তাকে মেনে নেয়নি। পরিবার দ্বারা তিনি বহিষ্কৃত হন এবং নির্বাসিত জীবনকে বেছে নেন।

এরপর সে হাম রেল যা পারো উপত্যকায় একটি অংশ সেখানে বসতি স্থাপন করেন। স্থানীয় অনেক সন্ন্যাসী ও ঠাকুরদের গিয়েচোক দ্বারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। তারা সকলেই গিয়েচোকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন। শুধুমাত্র ড্রিলপো নামের একজন আনুগত্য প্রকাশ করেনি। সে গ্রামের মানুষদের অনেক অত্যাচার করত এবং তাদের ধন-সম্পদ লুন্ঠন করে নিয়ে যেত। গ্রামের মানুষদের রক্ষা করার জন্য গিয়েচোক ড্রিলপোকে দমন করলেন। পরবর্তীতে গ্রামবাসীরা তাকে অনুরোধ করল সেই গ্রামে থেকে যাওয়ার জন্য এবং তারা সিদ্ধান্ত নিলো একটি প্রাসাদ তৈরির। তখনই পারো উপত্যকার কাজকর্ম নির্মাণ করা হয়েছিল। কিছু বিল্ডিং ও ধ্বংসাবশেষ ১৯০৭ সালে আগুনের কারণে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তবে এখন এগুলো পুনঃসংস্করণ করা হয়েছে।

রিং পুং ডিজং-এর প্রবেশপথ। ছবি : তিব্বত ডিসকভারি

 রিং পুং ডিজং বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এর স্থাপত্য ক্রিয়ার নিখুঁত ডিজাইন এবং প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ শিল্পকর্মের সমৃদ্ধ সম্ভারের জন্য। দেয়ালের ওপর আঁকা চিত্রকর্মগুলো শত শত বছরের পুরনো গল্পগুলো বলে উঠে। কাঠের ওপর করা উজ্জ্বল রঙের নকশাগুলো জায়গাটিকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ভুটানের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ডিজং-এর মত পারো ডিজং-এর দুটো অংশ রয়েছে। সামনের দিকের অংশটি প্রশাসনের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং পেছনের দিকের অংশটি সন্ন্যাসীদের আশ্রম। সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল থেকে প্রশাসনের জন্য জায়গাটি প্রায় ৬ মিটার উঁচু। আপনি উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবেশ দ্বার দিয়ে ঢুকে সরাসরি তিনতলায় চলে যেতে পারবেন। ভেতরকার কেন্দ্রীয় টাওয়ারগুলো প্রায় পাঁচ তলা পর্যন্ত এবং এগুলো তৈরি করা হয়েছিল ১৬৪৯ সালে। পশ্চিম দিকে পৌঁছলে দেখতে পাবেন সোনালী ও কালো রং করা কাঠের ওপর কিছু শিল্পকাজ। সন্ন্যাসীদের  জন্য নির্মিত আবাসস্থলে একসাথে প্রায় ২০০ জন সন্ন্যাসীদের জায়গা করে দিতে পারে। উত্তর-পশ্চিমে দেখতে পাবেন ম্যান্ডেলা অবয়ব যা সম্পূর্ণ ভুটানের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে ও অর্থবহ রুপকে প্রকাশ করে। প্রার্থনার জন্য বিশেষায়িত জায়গাটিতে যে মূর্তিগুলো রয়েছে সেগুলো মিলারেপা নামক এক কবিকে বর্ণনা করে ও তার গুণগানকে প্রকাশ করে।

ভুটানের মানুষেরা অধীর আগ্রহে থাকে এই টেসেকু উৎসবের জন্য। ছবি : সংগৃহীত

 টেসেকু উৎসব ভুটানে বেশ জনপ্রিয়। পঞ্জিকার একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই ধর্মীয় উৎসব পালন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এখানে আসে। ভুটানের নিজস্ব ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে দ্বিতীয় মাসের ১০তম থেকে ১৪ তম দিন পর্যন্ত এই উৎসব পালন করা হয়। যারা এখানে আসে সকলেই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও জুয়েলারি পরিধান করে থাকে। এখানে আগত সকলে বেশ উপভোগ করে পরিবার বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের সাথে একত্রিত হয়ে উৎসবমুখর আনন্দ ভাগাভাগি করতে পেরে। বিস্তৃত আঙ্গিনায় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য প্রদর্শিত হয় বিশেষ এক মুখোশ পরিধান করে। তবে শেষ দিন প্রদর্শিত নৃত্য হয় সেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন। এখানকার আবহাওয়া অনেকটা শান্ত প্রকৃতির। বছরের যেকোনো সময়েই এখানে ঘুরতে আসা যায়। শুধু দিনেই নয় রাতের সময় এখানকার সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়। রাতের বেলায় এখানে রাজপ্রাসাদগুলো আরও আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে এক অনন্য প্রাসাদে রূপান্তরিত হয়।

যেন এক টুকরো আলোকিত রাজ্য, রিং পুং ডিজং। ছবি : সংগৃহীত

 এটি যেহেতু একটি ধর্মীয় স্থান এখানে আসলে অবশ্যই ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে প্রত্যেক পর্যটককে। আর পোশাকের প্রতি যথেষ্ট দৃষ্টি রাখতে হবে। হাতকাটা বা ছোট কোনো পোশাক পরিধান করা যাবে না। চেষ্টা করুন ফুলহাতা কোন পোশাক পরিধান করতে। সব জায়গায় জুতা খোলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই কিন্তু কিছু কিছু হল রয়েছে সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে জুতা খুলে প্রবেশ করা বাঞ্ছনীয়। এখানে ছবি তোলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো বিধিনিষেধ নেই, তবে অনুমতি নিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করাই শ্রেয়। টেসেকু উৎসব খুবই  জনপ্রিয় যে এখানে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আগে থেকেই টিকেট কেটে রাখতে হয়। আর এখানে নৃত্যগুলো অনেকটা সময় নিয়ে প্রদর্শিত হয়ে থাকে। আপনি যদি এক সেকেন্ডও মিস করতে না চান তাহলে সকাল-সকাল আঙ্গিনায় উপস্থিত হতে হবে।

কীভাবে যাবেন : বাংলাদেশ থেকে ভুটানে যেতে হলে প্রথমত আপনাকে বিমানে করে ভুটানের পারো বিমানবন্দরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার খরচ পরবে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট। বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর ট্যাক্সিতে করে মাত্র ৪ মিনিট ব্যবধানে আপনি পৌঁছতে পারবেন রিং পুং ডিজং-এ।

থাকার ব্যবস্থা এবং খাওয়া-দাওয়া : এখানে পর্যটকদের থাকার জন্য সীমিত মূল্যেই বেশ কিছুসংখ্যক হোটেল রয়েছে। আর রিং পুং ডিজং-এ অবস্থিত রেস্টুরেন্টগুলোতে স্বল্পমূল্যে সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করানো হয়। আপনি যদি স্থানীয় খাবার ছাড়াও ভারতের কিংবা চীনের খাবার খেতে চান সেটিও সম্ভব।